ঢাকা
ঢাকা, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
ঢাকা
ঢাকা, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
শেষ আপডেট ১৪ সেকেন্ড পূর্বে
Home » সর্বশেষ » বিদ্যুৎ বিলের বোঝা : সাধারণ মানুষের নীরব কষ্ট

বিদ্যুৎ বিলের বোঝা : সাধারণ মানুষের নীরব কষ্ট

বর্তমান সময়ে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সীমিত আয়ের মানুষের জন্য দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই যখন কঠিন হয়ে পড়েছে, তখন মাস শেষে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ বিল যেন সেই কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দেয়।


বিদ্যুৎ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। আলো, পাখা, ফ্রিজ, টেলিভিশন, পানির পাম্পসহ প্রয়োজনীয় নানা কাজে বিদ্যুতের ব্যবহার ছাড়া বর্তমান জীবন কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু বিদ্যুতের ব্যবহার যেমন প্রয়োজন, তেমনি এর বিল পরিশোধ করাও প্রতিটি গ্রাহকের দায়িত্ব। প্রশ্ন হচ্ছে—সাধারণ মানুষ যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, সেই অনুযায়ী কি তাদের বিল যথাযথভাবে নির্ধারিত হচ্ছে?

বিদ্যুৎ বিল কমানোর জন্য অনেক পরিবার নিজেদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন আনতে বাধ্য হচ্ছে। রাতে বাসার সবাই এক ঘরে ঘুমাই, যাতে একটি মাত্র ফ্যান চলে এবং বিদ্যুৎ খরচ কিছুটা কম হয়। অপ্রয়োজনীয় লাইট বন্ধ রাখি, প্রয়োজন ছাড়া বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করি না। অনেকেই দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করেন। এতসব সচেতনতার পরও মাস শেষে যখন বিদ্যুৎ বিলের অঙ্ক হাতে আসে, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—আমরা যতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি, তার তুলনায় বিল কি সঠিকভাবে নির্ধারিত হচ্ছে?

অবশ্যই বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু একজন গ্রাহক যথাসম্ভব বিদ্যুৎ সাশ্রয় করার পরও যদি অস্বাভাবিক বেশি বিলের মুখোমুখি হন, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা দরকার। মিটার সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, সঠিক সময়ে সঠিক রিডিং নেওয়া হয়েছে কি না, পূর্ববর্তী ও বর্তমান রিডিংয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না এবং বিল তৈরির প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল বা অসঙ্গতি হয়েছে কি না—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতার সঙ্গে পরীক্ষা করা উচিত।
বিশেষ করে স্বল্প ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের কথা আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একজন মানুষের মাসিক আয় যদি সীমিত হয়, তাহলে সেই আয়ের একটি বড় অংশ যখন খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়ে যায়, তখন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল তার জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় আর্থিক চাপ। অনেক পরিবারকে তখন প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়।

এখানে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিলের মাধ্যমে যে বিপুল অর্থ আদায় করা হচ্ছে, সেই অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে—এ বিষয়ে সাধারণ জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের বিষয়গুলো সহজ ও বোধগম্যভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা হলে মানুষের আস্থা আরও বাড়বে। তাই বিদ্যুৎ বিল নির্ধারণ ও আদায়ের পাশাপাশি অর্থের ব্যবহার সম্পর্কেও যথাসম্ভব স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে গ্রাহকের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর হওয়া দরকার। কোনো গ্রাহক যদি মনে করেন তার বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি এসেছে, তাহলে তাকে যেন হয়রানি ছাড়াই দ্রুত মিটার পরীক্ষা, রিডিং যাচাই এবং প্রয়োজনে বিল সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়। একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত গ্রাহকের আস্থা অর্জন করা।

বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য প্রয়োজন। তাই বিদ্যুৎ ব্যবহারে জনগণ যেমন সচেতন হবে, তেমনি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে। সঠিক মিটার রিডিং, নির্ভুল বিল, সহজ অভিযোগ নিষ্পত্তি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা—এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
আমরা বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে চাই, নিয়ম মেনে বিল পরিশোধ করতে চাই এবং দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নে সহযোগিতা করতে চাই। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা চাই, আমাদের পরিশোধ করা প্রতিটি টাকার হিসাব যেন স্বচ্ছ থাকে এবং আমরা যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করি, তার ভিত্তিতেই যেন ন্যায্য ও সঠিক বিল নির্ধারিত হয়।


একজন স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল শুধু একটি কাগজে লেখা কয়েকটি সংখ্যার সমষ্টি নয়—এটি তার পুরো মাসের সংসার পরিচালনার হিসাবকে এলোমেলো করে দেওয়ার মতো একটি বড় বোঝা। তাই সাধারণ মানুষের কষ্ট, সামর্থ্য ও বাস্তব জীবনযাত্রার কথা বিবেচনা করে বিদ্যুৎ বিল ব্যবস্থায় ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।

গাজী শহিদুল ইসলাম
কবি ও সংগঠক
সাধারণ সম্পাদক,
মুক্তেশ্বরী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ, যশোর

টাইম ডিশন ২৪ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।