তপন বাগচী
বিয়ের আচার-অনুষ্ঠানে যে গীত পরিবেশনের রেওয়াজ রয়েছে, তা-ই বিয়ের গীত এবং ব্যাপক অর্থে ‘মেয়েলি গীত’ নামেই পরিচিত, যা আমাদের মা-বোন-দাদি-নানিরা পরিবেশন করেন। কিন্তু বিয়েকেন্দ্রিক আচার ছাড়াও নানা উপলক্ষে; যেমন—বিয়ের পরে সাধভক্ষণ, শিশুর ষষ্ঠীব্রত, শিশুর মুখেভাত প্রভৃতি উপলক্ষেও গ্রামীণ মেয়েরা আনন্দেই তাত্ক্ষণিকভাবে রচনা করেন এসব গান।
বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান উপলক্ষ করে রচিত এই গানে সময়ের ও সমাজের ছাপ যেমন ফুটে ওঠে, তেমনি ধরা পড়ে গাতকের তথা নারীর সুখ-দুঃখ ও হাসি-কান্নার কথা। সংগীতের আবরণে এ এক সামাজিক ইতিহাস বটে!
বাংলাদেশের বিয়ের গীত
বিয়ের গানের নানা পর্ব আছে; যেমন—কন্যা সাজানোর সময় নারীরা যে গান পরিবেশন করেন, তাতে রয়েছে রাধা-কৃষ্ণের রূপক। কনে সাজাতে ব্যবহূত হতো অগুরু চন্দন। এই চন্দনের ব্যবহার এখনো রয়েছে—
‘এসেছি এসেছি মোরা রাধাকে সাজাতে
সাজাব নতুন সাজে অগুরু চন্দনে।
গো অগুরু চন্দনে\’
কেবল ‘চন্দন’ বা ‘অগুরু চন্দন’ মানে সুগন্ধিযুক্ত চন্দনের মাটি দিয়ে সাজানো। কনে সাজাতে যে টিকলি, কানপাশা, নাকপাশা, অনন্ত লাগে, তারই উল্লেখ রয়েছে প্রথম অন্তরায়—
‘কপালে টিকিলি দিব কানে কানপাশা,
হাতেতে অনন্ত দিব নাকে নাকপাশা।
চন্দন কাজল রাধার মুখেতে পরাব
শ্রীকৃষ্ণেরই বাম ভাগে আদরে বসাব।
গো আদরে বসাব\’
এখানে ‘অনন্ত’ নামে অলংকারের উল্লেখ রয়েছে।
এটি বাহুতে পরার এক ধরনের অলংকার। এই অলংকারের নাম এখন শুনতে পাওয়া যায় না। বিয়ের গানে বিধৃত হয়েছে অলংকারের ঐতিহ্যের কথা। গানটির আভোগে রয়েছে—
‘রাধা-কৃষ্ণের মিলন হবে সাক্ষী দেবতা।
সতী নারীর কথা যেন না হয় অন্যথা\’
বাংলাদেশের বিয়ের গীত
এখানে দেবতাকে সাক্ষী রেখে বিয়ের শুভ কামনা জানানো হয়েছে।
সতী নারীর কথা যেন বৃথা না যায়, সেই কামনাও জানানো হয়েছে। কনে সাজাতে সাজাতে ঘর ভর্তি নারীরা এই গান পরিবেশন করে সময়টুকু আনন্দময় করে তোলার পাশাপাশি আশীর্বাদ জানানোর সুযোগও গ্রহণ করেন।
উত্তরবঙ্গ থেকে কনে সাজানোর একটি গানের দেখা পাওয়া যায়, ভাওয়াইয়ার বৈশিষ্ট্যে। সেখানে স্থাননাম, ধানের নাম, পাখির নামও রয়েছে। সেরা হাটের আনন্দ আর সেরা ধানের সৌন্দর্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে ‘চেংরী মাইয়ার হাসি’ অর্থাত্ কনের হাসির। সেই হাসিকে তুলনা করা হয়েছে কাকাতুয়ার সুরের সঙ্গে—
‘হাটের মধ্যে বাউরার হাট, ধানের মধ্যে কাশী
সেই মতন দেখু, দাদা, চেংরী মাইয়ার হাসি।
চেংরী মাইয়ার হাসিরে মোর কাকাতুয়ার আও
এ গানে ছড়াছে, দাদা, মোর ট্যানাটার গাও।’
বিয়ের আগে বর-কনের শুভদৃষ্টি হয় হিন্দু সমাজে। বর-কনে মুখোমুখি দাঁড়ানো থাকে। দুজনেরই চোখ বাঁধা থাকে কাপড় দিয়ে। তারপর দুজনের মাথার ওপর আরেকটি কাপড় ঢেকে দেওয়া হয়। এরপর চোখের বাঁধন খুলে দিলে শুধু দুজনের চোখাচুখি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এই শুভদৃষ্টি মুহূর্তকে আনন্দময় করে তোলার জন্য পরিবেশন করা হয় গান। ঢাকা অঞ্চলে প্রচলিত শুভদৃষ্টির গান এ রকম—
‘হের গো সবে যুগল মিলন কর সফল নয়ন\
শ্যামের বরণ কালো রাই করেছে আলো
আবার হেসে চেয়ে আছে মরি কি মোহায়\
শ্যাম পানে চেয়ে রাধায় আঁখি হানে গো
হের গো সবে যুগল মিলন\’
চোখে-চোখে চাওয়ার মধ্য দিয়েই বিয়ের বীজ রোপিত হয়ে যায়, ঘটে যায় যুগল মিলন। এই গানে রয়েছে তারই ইঙ্গিত। এরপর নদীর ঘাটে দল বেঁধে গ্রামের মেয়েরা যান কলসি ভরে জল আনতে। তখন তাঁরা নেচে নেচে গাইতে থাকেন—
‘পান দিলাম বিড়া বিড়া, গুয়া উত্তম ফল
রাজহংসের ডিম্বা দিলাম গঙ্গার নিমন্ত্রণ।
পরন শাড়ি নীলাম্বরী ওড়না দিয়ে গায়
সখির সঙ্গে মনোরঙ্গে জল ভরিতে যায়।
জল ছাড়া মেঘ নাই রে, রৌদ্র ছাড়া মেঘ
কৃষ্ণ ছাড়া শ্রীরাধিকা বাঁচিবে কত কাল।’
এই গান তো জল আনতে যাওয়ার পথে গাওয়া হয়। কিন্তু নদী, খাল কিংবা পুকুরঘাটে গিয়ে জল ভরার সময় আবার ভিন্ন প্রসঙ্গ, ভিন্ন সুরের গান ছলকে ওঠে—
‘আমি ভইরে আইলাম
শীতল গঙ্গার জল
কালার রূপ নেহারি প্রাণসজনীর
মন করেছে উতল।
নন্দের বেটা চিকন কালা
জানে কত ছল
সে যে জল ঢালিয়া প্রাণসজনীর
ঘাট করছে পিছল।
মনচোরা চিকন কালা
হাসে খলখল
সে যে বারে বারে আঁখি ঠারে
দেখায় কদমতল\’
এই যে কদমতলা, সে তো শ্রীকৃষ্ণের লীলাক্ষেত্র। পাশে তো যমুনা থাকার কথা। এই গানে আছে গঙ্গার কথা। নন্দের বেটা বলে তো বংশীধারী কৃষ্ণের কথাই বোঝানো হয়েছে। এখানে নদীর জলের পবিত্রতা বোঝাতে গঙ্গার কথা বলা হয়েছে। বিয়ের গানে অনেক গভীর তত্ত্বের সন্ধান মেলে।
বিয়ের পর কনেকে সাজাতে গিয়ে আবারও গান হয়। এবার যেন বৃন্দাবনের আনন্দ ফুটে ওঠে। কারণ বৃন্দাবন তো রাধা-কৃষ্ণের মিলনস্থল। তাই বৃন্দাবনে প্রেরণের আগে রাধার যেমন প্রস্তুতি হয়, তেমনি প্রস্তুত করাতে হয় কনেকে—
‘সাজ সাজ ধনি,
বেঁধে মোহন বেণি
সাজাইব রস বৃন্দাবন।’
আবার কখনো কনের পোশাক নিয়ে রঙ্গরসের অবতারণা হয়। কনে যেন সেমিজ না পরে শাড়ি পরে, এটিই বরের ইচ্ছা। সেটি তুলে ধরা হয় গানে—
‘শাড়ি পরো ওগো রাই
তাইতে শ্যামের বারণ নাই।
শেমিজ পরাতে শ্যামে নিষেধ কইরাছে।’
একই উপলক্ষে কোনো কোনো অঞ্চলে আবার শাড়ি পরানো নিয়ে গান করা হয়—
‘গাও তোলো গাও তোলো কন্যা হে
পিন্দা পাটের শাড়ি
এই শাড়ি পিন্দায়া কন্যা
যাইবেন শ্বশুরবাড়ি হে।
গাও তোলো গাও তোলো কন্যা হে\’
পাটের শাড়ির প্রচলন কি গ্রামে ছিল? তাঁতের শাড়ি হওয়াই সংগত ছিল। মূলত সুতার শাড়ি বাদে অন্য শাড়িকে কৃত্রিম আঁশের শাড়ি বিবেচনা করা হতো। গ্রামে ওইসব শাড়িকেই পাটের শাড়ি বলা হতো।
শুধু কন্যাকে স্নান করানোর গান নয়, বরকে স্নান করানোর সময়টাও আনন্দমুখর করতে গানের আয়োজন করা হতো।
‘সিনান ঘাটে বসিয়া না ভাবিও ওরে বাপু
এই সিনান তোর শেষ সিনান রে বাপৈ।
আগত্ যে সিনাই ছিলা বাপৈ
আথারে পাথারে ভুলি যা এলা সেই গিলা।’
এই স্নান যেন শেষ স্নান না হয়, সেই প্রার্থনা জানানো হয়েছে। শেষ স্নান এখানে মৃত্যুর প্রতীক। অথচ বিয়ে তো নতুন জীবনের প্রতীক। বিয়ের আগের স্নান আর কবরের আগে স্নানের মধ্যে জন্ম-মৃত্যুর যে প্রতিচ্ছায়া, তা ফুটে উঠেছে সাধারণ গ্রামীণ নারীর গানে।
যখন কনের বাড়ি থেকে কনেকে নিয়ে বর নিজের বাড়িতে যান, তখন এক হূদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। কন্যার চোখ থাকে অশ্রুসজল। কনের বাড়ির লোকজন থাকে সমব্যথী। বিদায়ের করুণ সুরে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। গানে গানে ধরা পড়ে সেই আবহ।
বিয়ের সবচেয়ে জমজমাট গানের আয়োজন হয় গায়েহলুদে। এখন শহরেও গায়েহলুদে গানের আয়োজন করা হয় আধুনিক যন্ত্রানুষঙ্গে। গ্রামীণ সমাজে গাওয়া হতো—
‘তেল না হলুদ রে ডগমগ করে রে
আঁচল দিয়া পুঁছো বাছার ঘাম রে।
কাঁহা না গেল রে কন্যা বিবির মাও রে
সিনা বইহা পড়ে বিবির ঘাম রে।
কাঁহা না গেল রে বিবির খালা মাও রে
গতর বইহা পড়ে বিবির ঘাম রে।
কাঁহা না গেল রে বিবির বড় ভাউজ রে
সর্ব শরীল বইহা পড়ে বিবির ঘাম রে।’
চলচ্চিত্রে বিয়ের দৃশ্যের জন্য লেখা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামনের একটি গান ‘হলুদ বাটো মেন্দি বাটো, বাটো ফুলের মৌ’ একসময় প্রায় সব বিয়ের অনুষ্ঠানেই বাজানো হতো—তা গ্রামেই হোক আর শহরেই হোক। গানটির কথা এমন—
‘হলুদ বাটো মেন্দি বাটো, বাটো ফুলের মৌ
বিয়ার সাজে সাজবে কন্যা করমচা-রং বৌ রে\
সুরমা-কাজল পরাও কন্যার ডাগর নয়নে
আলতারেখা টানা দুটি রাঙা চরণে
সখির রাঙা চরণে, ও কন্যার রাঙা চরণে
ভরা কলস ছলাত্ ছলাত্ দাওয়ায় এনে থোও\’
এ গানটি জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের বিয়ের গান হিসেবে গৃহীত হয়েছে। ‘আইলো রে নয়া দামান্দ আসমানেও তেরা/বিছানা বিছাইয়া দেও, শাইল ধানের নেরা।/দামান্দ বও, দামান্দ বও’ গানটি প্রবল পরিচিতি লাভ করেছে ইউটিউব আর ফেসবুকের কল্যাণে। সিলেট অঞ্চলে মুসলিম সমাজে প্রচলিত বিয়ের গানই নতুনরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়ে বিয়ের আসর ছাড়িয়ে সাধারণ গান হিসেবেও নন্দিত হয়েছে।
জন্ম-মৃত্যুর মতো বিয়েও একটি স্বাভাবিক ঘটনা। জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে আনন্দময় করে তুলতে গানের কোনো বিকল্প নেই। তাই আদিম সমাজ থেকে শুরু হয়ে এখনো এই গান চলছে। সমাজে মানুষ যত দিন আছে, বিয়ের গানও তার আবেদন নিয়েই টিকে থাকবে।
ছবি : ছায়াছবি
লেখক : বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত ফোকলোরবিদ ও কবি। পরিচালক, বাংলা একাডেমি, ঢাকা
kalerkantho
