আধুনিক খাদ্যাভ্যাসের নামে চকচকে মোড়ক, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন আর ‘হেলদি’ ট্যাগলাইন—সব মিলিয়ে ভোক্তাকে সহজেই প্রলুব্ধ করছে বাজারের আল্ট্রা-প্রসেসড খাবার। অথচ এই নীরব প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য তৈরি করছে গভীর সংকট, যার সবচেয়ে বড় শিকার শিশু ও কিশোররা।
ভারতের হায়দরাবাদে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত পুষ্টি গবেষণা কেন্দ্র ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন এই গবেষণা করে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশজুড়ে পরিচালিত এক সমীক্ষা প্যাকেটজাত খাবারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকিকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিস্কুট, সফট ড্রিংকস, চকোলেট, ইনস্ট্যান্ট নুডলস থেকে শুরু করে রেডি-টু-ইট খাবার—প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকা এসব পণ্যে অতিরিক্ত চিনি, কৃত্রিম ফ্লেভার, রং ও বিভিন্ন অ্যাডিটিভের উপস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বেশি।
২৩ হাজার পণ্যের উদ্বেগজনক চিত্র
সমীক্ষায় ২৩ হাজারেরও বেশি খাবার ও পানীয়ের লেবেল বিশ্লেষণ করা হয়।
এআই-নির্ভর প্রযুক্তির মাধ্যমে ২৫টিরও বেশি উপাদান যাচাই করে গবেষকরা দেখেন—বাজারে থাকা বহু পণ্যে নিয়মিতভাবে ব্যবহার হচ্ছে কৃত্রিম স্বাদ, রং ও সংরক্ষণকারী উপাদান।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও চমকে দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্যের উপাদান বিশ্লেষণে।
এই বিশ্লেষণ আল্ট্রা-প্রসেসড ফুডের বিস্তৃত ও গভীর প্রভাবকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
বিস্কুট- স্ন্যাকসেও রাসায়নিক উপাদান
সকালের খাবারে মিষ্টি স্বাদের ‘সিরিয়াল’-এর ক্ষেত্রেও ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পণ্যে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান পাওয়া গেছে।
একইভাবে প্রায় ৮০ শতাংশ প্যাকেটজাত স্ন্যাকসে অতিরিক্ত সোডিয়ামের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।
সমীক্ষায় দেখা যায়, বাজারে থাকা ৮০ শতাংশেরও বেশি বিস্কুট ও কুকিজে কৃত্রিম ফ্লেভার ও পাম অয়েলের ব্যবহার রয়েছে। চকোলেট ও ডেজার্টের একটি বড় অংশেও চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের মাত্রা নির্ধারিত নিরাপদ সীমার তুলনায় অনেক বেশি।
পানীয় ও রেডি ফুডে অতিরিক্ত কেমিক্যাল
গরমের আরামে অনেকেই পথে-ঘাটে পানীয় লুফে নেন। এ ছাড়া নাগরিক ব্যস্ত জীবনে রেডি ফুডেও অভ্যস্ত অনেকেই।
গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৭৮ শতাংশ রেডি-টু-ড্রিংক ডেয়ারি বেভারেজে অতিরিক্ত চিনি রয়েছে। ৯৮ শতাংশ কার্বনেটেড পানীয়তে কৃত্রিম অ্যাডিটিভের উপস্থিতি মিলেছে। অন্যদিকে প্রায় ৯০ শতাংশ কনভিনিয়েন্স মিল বা প্রস্তুত খাবারে উচ্চমাত্রার সোডিয়াম পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ৯৬ শতাংশ পণ্যে বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম উপাদান ব্যবহারের প্রমাণও উঠে এসেছে, যা সামগ্রিকভাবে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গ্রামেও গ্রাস করেছে এসব পণ্য
শুধু শহুরে মানুষেরাই নয় বরং রং চকচকে পণ্যের ভয়াল গ্রাসে আক্রান্ত প্রান্তিক জীবনের সাধারণ জীবনযাপনও। এসব আল্ট্রা-প্রসেসড খাবারের প্রতি প্রান্তিক মানুষেরও নির্ভরতা দ্রুত বাড়ছে।
সমীক্ষায় উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয়, এই খাবারগুলিকে স্বাস্থ্যকর বা দৈনন্দিন খাওয়ার উপযোগী বলে বাজারজাত করা হয়, অথচ সেগুলির বড় অংশ নিয়মিত খাওয়া নিরাপদ নয়!
মোড়কের লেভেল পড়ার প্রবণতায় বড় ফাঁক
প্যাকেটের বাহ্যিক প্রচারনা মানুষকে আকৃষ্ট করলেও ভেতরের উপাদান সম্পর্কে সচেতনতা তুলনামূলকভাবে কম। বিশেষত গ্রামের অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত অধিকাংশ মানুষ খাবারের প্যাকেটের প্রচারকেই বেশি গুরুত্ব দেন, উপাদানের তালিকাও খুঁটিয়ে পড়ে না।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউট্রিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৭৫.৪% মানুষ ফুড লেবেল দেখেন। তবুও মাত্র ১৪.৭% উপাদান তালিকা গভীরভাবে যাচাই করেন। বাকি ভোক্তারা শুধুই মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ যাচাই করেন কিংবা ব্র্যান্ডের নাম দেখেই পণ্য কিনে ফেলেন।
দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সতর্কতা
চকচকে মোড়ক, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন আর স্বাদের প্রতিশ্রুতির আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের নিয়মিত গ্রহণ স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে এই প্রভাব দ্রুত বাড়ছে।
শুধু ক্যালরি নয়, উপাদানই আসল
গবেষকদের মতে, খাবারের ক্ষেত্রে শুধু ক্যালরি গণনা যথেষ্ট নয়। লেবেলে থাকা প্রতিটি উপাদান সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। ‘লো-ফ্যাট’ বা ‘হেলদি’ লেবেল সব সময় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না—এটাই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পণ্যকে ‘স্বাস্থ্যকর’ বা ‘দৈনন্দিন উপযোগী’ হিসেবে বাজারজাত করা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। তাই—পণ্যের লেবেল সম্পর্কে আরো গভীর যাচাই করার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। সর্বোপরি, ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধিই এমন রঙিন বিষ থেকে নিজেদের এবং শিশুদের বাঁচাতে পারে।kalerkantho
